নিউজ ডেস্ক | শনিবার, ০৪ জানুয়ারি ২০২৫ | পড়া হয়েছে 107 বার
মেহেরপুরে উৎপাদিত সবজির দাম ও ক্রেতা না থাকায় জমিতেই নষ্ট হচ্ছে ফুলকপি। এসব ফুলকপি এখন গো খাদ্য হিসেবে নিচ্ছেন স্থানীয় লোকজন। কৃষকরা জমি পরিষ্কার করে অন্য সবজি আবাদের প্রস্তুতিও নিচ্ছেন। অনেক স্বপ্ন নিয়ে শীতকালীন ফুলকপি চাষ করেছিলেন চাষিরা। কিন্তু এখন উৎপাদন খরচই মিটছে না। লোকসানে ঋণের বোঝা নিয়ে দুশ্চিন্তায় দিন পার করছেন মেহেরপুরের চাষিরা।
জানা গেছে, স্বল্প খরচে বেশি মুনাফা পাওয়ার আশা নিয়ে রোপণ করা ফুলকপি এখন লোকসানে ফেলেছে চাষিদের।
কৃষকরা বলছেন, প্রতি বছর শীতকালীন সবজি হিসেবে ফুলকপির চাহিদা থাকে, দামও ভালো পান তারা। লাভের আশায় চলতি মৌসুমে অনেকেই ফুলকপির চাষাবাদ করেছেন। কিন্তু এ বছর নানান জাতের সবজিতে বাজার ভরে যাওয়ায় উৎপাদন ভালো হলেও মুনাফার অঙ্ক শূন্যের ঘরে।
মেহেরপুরের সাহারবাটি সবজি গ্রাম নামেখ্যাত। সেখানেও কপির চাষ করেছেন চাষিরা। এ ছাড়া সদর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায়ও প্রচুর চাষাবাদ হয় ফুলকপি ও বাঁধাকপির। জেলার চাহিদা মিটিয়ে মেহেরপুরের চাষিদের উৎপাদিত ফুলকপি রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশের পাইকারি বাজারে বিক্রি হয়। জেলার চাষিরা খেতেই এসব ফসল বিক্রি করেন পাইকারদের কাছে। তারা ট্রাকবোঝাই করে ঢাকায় নিয়ে বিক্রি করেন। মেহেরপুর থেকে প্রতিদিন প্রায় শতাধিক ট্রাক ভর্তি হয়ে ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় বিক্রির জন্য নিয়ে যাওয়া হতো। অথচ এ বছর ট্রাক ভাড়া না ওঠায় দু-একটা করে ট্রাক যাচ্ছে ঢাকা, চট্টগ্রাম, বরিশাল, ফেনি ও সিলেট জেলায়।
প্রতিটি কপির উৎপাদন খরচ পড়ে ৭/৮ টাকা। সেখানে বর্তমান বাজারে চাষিদের খেতে প্রতি পিস ফুলকপি বিক্রি হচ্ছে ৩/৫ টাকায়। ফলে উৎপাদন খরচের অর্ধেকও উঠছে না। এ ছাড়া চাষিদের পারিশ্রমিকও প্রায় শূন্য। যারা ঋণ নিয়ে চাষাবাদ করেছেন তারা তা কীভাবে শোধ করবেন তা নিয়ে পড়েছেন দুর্ভাবনায়।
মেহেরপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর থেকে প্রাপ্ত তথ্যমতে জেলায় এ বছর ফুলকপির আবাদ হয়েছে ১ হাজার ১২০ হেক্টর, বাঁধাকপির আবাদ হয়েছে ১ হাজার ৬০ হেক্টর। এর মধ্যে গাংনী উপজেলায় বিভিন্ন মাঠে ১৬০ হেক্টর ফুলকপি এবং ১৫৫ হেক্টর বাঁধাকপির আবাদ হয়েছে।
গাংনীর বাঁশবাড়িয়া গ্রামের চাষি শরিফুল ইসলাম বলেন, আমরা গত বছর ৬ বিঘা জমিতে ফুলকপির আবাদ করে বিঘাপ্রতি লাভ পেয়েছিলাম সাড়ে ৩ লাখ টাকা লাভ হয়েছিল। সেই আশায় এবার ১১ বিঘা জমিতে ফুলকপির আবাদ করেছিলাম। সময়মতো বিক্রি করতে না পারায় জমিতেই সব কপি নষ্ট হয়ে গেছে।
ভাটপাড়া গ্রামের কৃষক রেজাউল হক, নওপাড়া গ্রামের কৃষক লাভলু বলেন, দুই বিঘা জমিতে শীতকালীন ফুলকপির আবাদ করেছিলাম। একেকটি কপির ওজন হয়েছিল দেড় থেকে দুই কেজি ওজন। ক্রেতা নাই, তাই জমি ছেড়ে চলে এসেছি। অনেকেই গরু ছাগলের জন্য নিয়ে যাচ্ছেন। সার ও কীটনাশকের দোকানের বকেয়া,জ মির লিজ খরচের টাকা নিয়ে খুব বিপদে আছি।
সাহারবাটি গ্রামের কৃষক শিরাজুল ইসলাম বলেন, দুই বিঘা জমিতে ফুলকপির আবাদ করেছিলাম। ৫ হাজার টাকায় বিক্রি করেছি। দুই বিঘা জমিতে ৫০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। সব টাকাই লোকসান। পরে জমি পরিষ্কার করতেও শ্রমিক খরচ হয়েছে।
কলোনিপাড়ার কৃষক আলমগীর হোসেন বলেন, দেড়বিঘা জমির ফুলকপি বিক্রি করতে না পেরে জমিতে নষ্ট হচ্ছে। নেওয়ার লোক নাই, খাওয়ারও মানুষ নাই।
সাহারবাটির আজিজুল বলেন, ৩০ শতাংশ জমিতে ফুলকপির চাষ করেছি। এ জমিতে রোপণ করা ৫ হাজার চারায় উৎপাদন খরচ পড়েছে প্রতি পিস ৭/৮ টাকা। এখন ফুলকপির দাম প্রতি পিস খেতে বিক্রি করতে হচ্ছে ৩/৪ টাকা দামে। এটা এমন ফসল, পরিপক্ব হলে আর খেতে রাখা যায় না। রাখলে খেতেই নষ্ট হয়ে যায়। উৎপাদন খরচই পাচ্ছি না। এর ওপর ঋণের বোঝা রয়েছে। ঋণ পরিশোধ করব কী দিয়ে, আবার পরিবারের খরচসহ আগামীতে ফসল উৎপাদনের টাকাও রইল না। বেশি দামে বীজ-সার কিনে কম দামে ফসল বিক্রি করলে তো মূলধন হারিয়ে যাচ্ছে। বসায়ী ইদ্রিস আলী বলেন, আমরা যে দামে কপি কিনে ঢাকা ও চট্টগ্রামে নিয়ে যাচ্ছি তাতে ভাড়ার টাকা হচ্ছে না। দুবার লোকসান দিতে হয়েছে।
শ্রমিক সর্দার মোশাররফ হোসেন বলেন, প্রতিবছর এ সময় ট্রাক লোড করে ৫০/৬০ হাজার টাকা আয় করতাম। এ বছর কাজ করছি কিন্তু কপি চাষিরা শ্রমিক খরচ দিতে পারছেন না। দু-একটা ট্রাক লোড করছি অনেক গৃহস্থ ঘরে থেকে টাকা পরিশোধ করছেন।
এদিকে মেহেরপুরের কৃষকদের হতাশা দেখে ‘স্বপ্ন’ নামের একটি সংগঠন ইতোমধ্যে কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি ১০ হাজার পিচ ফুলকপি কিনেছেন ৫ টাকা পিচ দরে।
মেহেরপুর সদর উপজেলা হরিরামপুরের ফুলকপি চাষি রাকিব হোসেন বলেন, এ বছর আমি চার বিঘা জমিতে ফুলকপি চাষ করেছি। একবিঘা জমিতে ফুলকপির আবাদ করতে খরচ হয়েতে ২৫ হাজার টাকা। সঙ্গে রয়েছে শ্রমিক ও পরিবহন খরচ। লাভের মুখ দেখছি না, উলটো জমিতে ফুলকপি নষ্ট হয়ে যাচ্ছিল। স্বপ্ন আমাদের থেকে ১০ হাজার পিস ফুলকপি কিনেছেন।জেলা কৃষি বিপণন অনুসন্ধান কর্মকর্তা জিব্রাইল হোসেন বলেন, বর্তমানে বাজারে ফুলকপির সরবরাহ বেড়ে যাওয়ায় এই সবজির চাহিদা কমে গেছে। যার কারণে কৃষকরা লোকসানে পড়েছেন। লোকসান থেকে কিছুটা স্বস্তি দিতে বিভিন্ন ব্যবসায়ীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে কৃষকদের সঙ্গে সংযোগ করে দিচ্ছে কৃষি বিপণন অধিদপ্তর।
মেহেরপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক বিজয় কৃঞ্চ হালদার বলেন, প্রতিবছর এ মৌসুমে মেহেরপুরে ব্যাপকভাবে বাঁধাকপি ও ফুলকপির আবাদ হয়। হঠাৎ দরপতন হয়েছে। ফুলকপিগুলো বাইরের বাজারে পাঠানোর চেষ্টা করছি।
আকতারুজ্জামান/এএমকে